ঈসা মসীহ্‌ কি ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন?

ইদানিং কালে, ওয়াহাবি পৃষ্ঠপোষকতায় PeaceTV টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে জাকির নায়েক ও আহমেদ দিদাতের ধর্মীয় মতামতগুলো ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচার হয়েছে। এই চ্যানেলে অনেক ভাল কথা শোনা যায়—শালীনতা মেনে চলার উপদেশ, আল্লাহ্‌কে ভয় করার উপদেশ, ও ধর্মগ্রন্থ মাতৃভাষায় পড়ার উপদেশ। কিন্তু সে প্রোগ্রামগুলোর মধ্যেও কিছু ভ্রান্ত কাদিয়ানি ও ওয়াহাবী ধারণা প্রচার করা হচ্ছে, যেগুলো আল্লাহ্‌র কিতাবের আসল কথার বিপরীত।

যেমন, জাকির নায়েক ও আহমেদ দিদাত Swoon Theory (অজ্ঞান মতবাদ) নামক একটি কাদিয়ানি মতবাদ প্রচার করেন ঈসা মসীহ্‌র মৃত্যু সম্পর্কে, যেটা সর্বপ্রথমে আবিষ্কার করেছেন পশ্চিমা নাস্তিকেরা এবং মুসলমান চিন্তাধারায় প্রথম উপস্থাপন করেছেন ভ্রান্ত কাদিয়ানি দলটি। আসল পণ্ডিতরা এই Swoon Theory অবজ্ঞা করেন, এমনকি অ-খ্রীষ্টানরাও, এবং সেটা কিতাবের সত্যটা বিকৃত করে।

এই পুস্তকে আমরা কোরআন শরীফ, ইঞ্জিল শরীফ, এবং ইতিহাস দেখার চেষ্টা করব— এই প্রশ্নে, যে ঈসা মসীহ্‌ শলিবে মারা গেলেন কিনা। আমরা প্রশ্নগুলো এই ক্রমেই বিশ্লেষণ করব:

১. কোরআন শরীফ কি ঈসা মসীহের মৃত্যু অস্বীকার করে?
২. ইঞ্জিল শরীফ কি সত্যি বলেন যে ঈসা মসীহ্‌ ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন?
৩. ঈসা মসীহ্‌র মৃত্যুর কথা কি পূর্ববর্তী কিতাবে আছে?
৪. কাদিয়ানি ‘অজ্ঞান’ মতবাদ কি ঠিক হতে পারে?
৫. জাকির নায়েকের যুক্তি কি সত্য?
৬. ঐতিহাসিক তথ্যাদি কী বলে?

সূচিপত্র


কোরআন শরীফ ও ইসলাম কী বলে?

হযরত ঈসা মসীহ্‌র মৃত্যু সম্পর্কে ইসলামী মতবাদগুলো

জাকির নায়েক অনুযায়ী, ইসলাম ও কোরআন একবাক্যে মসীহের মৃত্যু অস্বীকার করেন, কিন্তু ব্যাপারটা সেরকম নয়। ঈসা মসীহের মৃত্যু সম্পর্কে নায়েকের ব্যাখ্যা হচ্ছে Swoon Theory নামক ১৯ শতাব্দীর পশ্চিমাতে-আবিষ্কৃত একটি অস্বীকৃত মতবাদ যেটা ইসলামী চিন্তাধারায় প্রথম উপস্থাপন করেছেন কাদিয়ানিরা। বর্তমান কালের অনেক মুসলমান মনে করেন যে ইসলাম অনুযায়ী হযরত ঈসা মারা যান নি বরং দৈহিকভাবে বেহেশতে তুলে নেওয়া হয়েছিল। আসলে, প্রধান মুফাস্‌সিরুন (ইসলামি তাফসীরবিদ) যেমন আল-তাবারী ও আল-রাজি এই ধারনা ভুলপ্রমাণ করেছেন, এরা বলেন যে মসীহ্‌র দৈহিক মৃত্যু হয়েছিল, এটি একটি কোরআন-সঙ্গত ব্যাখ্যা। কোরআন বলেন:

“হে ঈসা! আমি তোমাকে মরতে (মুতাওয়াফ্‌ফিকা ) দিব এবং আমার কাছে তোমাকে তুলিয়া লইব…”সূরা আলে-‘ইমরান ৩:৫৫

প্রাচীন মুসলমান তাফসীরকারী আল-তাবারি এই আয়াতের চারটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দেন, যার মধ্যে একটা হলো ঈসা আক্ষরিক অর্থে মারা গেছেন। তিনি লেখেন:

“এখানে ব্যবহৃত মৃত্যু (ওয়াফাত) শব্দটির মানে হচ্ছে আসল, আক্ষরিক মৃত্যু, অর্থাৎ “আমি তোমাকে আক্ষরিক অর্থে মরতে দিব।” ১

এইভাবে তাবারি কিছু হাদিস দিয়ে এই ব্যাখ্যার সমর্থন করেন। তাবারি কিন্তু নিজে বেশী পছন্দ করেন “অনুকল্প মতবাদ” (substitution theory), অর্থাৎ যে ঈসার রূপে অন্য একজন নির্দোষ ব্যক্তি ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন। বিখ্যাত তাফসীরকারী ফখরুদ্দিন রাজিও স্বীকার করেন যে কোরআনের এই অনুচ্ছেদের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে ঈসার আক্ষরিক দৈহিক মৃত্যু।২ কিন্তু, ছয়টি কারণে তিনি তাবারির পছন্দীয় ‘অনুকল্প মতবাদ’টি ভুলপ্রমাণ করেন (পৃষ্ঠা ৬ দেখুন) এবং আজকাল এই তত্ত্বের জনপ্রিয়তা নেই। মুসলমান অধ্যাপক ডাঃ কামাল হোসেন লেখেন:

ঈসা মসীহ্‌র জায়গায় একজন অনুকল্প মারা যাওয়ার ধারণাটি কোরআনে ব্যাখ্যা করা একটি অতি অমার্জিত ব্যাখ্যা। জনগণের কাছে এদের অনেক বোঝানোর প্রয়োজন ছিল। ইদানিংকালে কোন শিক্ষিত মুসলমান এটা বিশ্বাস করেন না।৩

ডাঃ মাহ্‌মুদ আইয়ুব লেখেন:

উদ্দেশ্য বা আকার যেটাই হোক না কেন, এই অনুকল্প মতবাদটি চলবে না…সেটা খোদায়ী ন্যায্যতা এবং মানবজাতির সঙ্গে আল্লাহ্‌র প্রাথমিক চুক্তিকে ব্যঙ্গ করে।৪

তাই আমরা দেখি যে হযরত ঈসার মৃত্যু সম্বন্ধে কোন একটি প্রধান “ইসলামি” মতামত নেই। প্রাচীন মুসলিম কর্তৃপক্ষগণ স্বীকার করতেন যে ঈসার আক্ষরিক মৃত্যু এটিও কোরআনের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা। এঁদের পছন্দ মতবাদ (অনুকল্প মতবাদটি) তাদের নিজের কথা অনুযায়ী অসম্ভাবনাপূর্ণ এবং তা মুসলমান চিন্তাধারায় আজকাল অস্বীকার করা হয়।

লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!
🤖
Christo Sangeet
Online Agent
খ্রীষ্টের প্রেমে স্বাগতম! আমি Christo Sangeet এর AI এজেন্ট। যেকোন ব্যাপারে আমাকে জিগ্যেস করতে পারেন।